ইউরোপে কি জ্যাম হয় না?

ইউরোপের শহর গুলো দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তাদের শহরেও আমাদের মত সরু রাস্তা। একটা বাড়ি আরেকটা বাড়ির সাথে গা ঘেষে একেবারে রাস্তার উপরে দাঁড়িয়ে আছে। কোন বিল্ডিং এ পার্কিং বা গ্যারাজ নাই। অফিস টাইমে রাস্তায় জ্যাম ও আছে। তাইলে উপায় কি?

তাদের সমাধানঃ

১। প্রাইভেট গাড়ি রাস্তার পাশে পার্ক করা যায়। কিন্তু প্রতিদিন হাজার টাকা খরচ করতে হয় পার্কিং বাবদ। এত খরচ সম্ভব না। তাই গাড়ি নিয়ে অফিসে আসা বিরাট বিলাসিতা।

২। অত্যন্ত সুন্দর চকচকে পাবলিক বাস। সব এলাকার অলি গলিতে চলে যায়। এক মিনিট এদিক ওদিক হয়না। বাসের জন্য আলাদা লেন আছে।

৩। প্রচুর সাইকেল। সাইকেলের আলাদা লেন আছে। সাই সাই করে করে চলে চলছে। দোকানদার থেকে শুরু করে আমলা, এম পি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, সবাই সাইকেলে চড়ে। আমরা যেমন বড় সড় জীপ গাড়ি থেকে নামা লোককে বিশেষ সম্মান দেই, ওরা সাইকেলে চড়া লোকদেরকে সেই সম্মানটা দেয়। বড় গাড়ি দেখলে সাংঘাতিক বিরক্ত হয়।

৪। যাদের দূর যাত্রায় সাইকেলে চালানোর শক্তি নাই তাদের জন্য আছে ব্যাটারী চালিত সাইকেল ও স্কুটি। এগুলো কেনার, বাড়িতে বা অফিসে পার্ক করা বা চার্জ দেওয়ার ঝামেলা নাই। মোবাইলে এপ ইন্সটল থাকলে সেই মোবাইল এই বাইকের কাছে নিলেই চালু হয়ে যায়। এক রাস্তার মোড় থেকে নিয়ে অফিসের কাছের মোড়ে নির্দিষ্ট যায়গায় রেখে অফিসে চলে গেলেই হয়।তারা এগুলো প্যাডেল করেই চালায়, টায়ার্ড কয়ে গেলে তখন ব্যাটারী চালু করে।

৫। হাটা। ইউরোপের রাস্তায় ভূড়ি ওয়ালা মানুষ পাওয়া যায় না। বুড়ো বুড়িরাও হন হন করে হাটে। দুই কিলোমিটার হাটা এদের জন্য বেড রুম থেকে কিচেনে যাওয়ার মত নিত্যদিনের কাজ।

এগুলো করে কী হয়?

রাস্তায় জ্যাম থাকে না। ধোয়া থাকে না। শব্দ থাকে না। খরচ কমে। রোগ বালাই কম হয়।

তাইলে বাংলাদেশে এরকম ব্যাবস্থা নাই কেন?

এটা শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত। যে দেশের মানুষ অথবা সরকার যত বেশি অশিক্ষিত সেই দেশের মানুষের গাড়ির প্রতি আকর্ষন তত বেশি। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার দেশ গুলোতে তাই এখনো গাড়ির প্রতি ভয়ানক আকর্ষন আছে। গাড়ি চালানোকে, বিশেষ করে বেশি তেল খরচ করা গাড়ির প্রসংসা করা হয় ! বাংলাদেশ এসব দেশকেই অনুসরন করে। পূর্ব এশিয়ান দেশ গুলোতে পাবলিক বাস ও সাইকেলের ব্যাবহার আগে থেকেই ছিল এখন আরো দ্রুত বাড়ছে। অথচ আমাদের দেশে সাইকেল প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত বলে রাখি মটর সাইকেল বিশেষ করে আমাদের দেশে যে রকম হাই স্পিড মটর সাইকেলে যাত্রী বহন করা হয় এগুলো বিপদজনক এবং ওসব দেশে যাত্রী পরিবহনে এরকম বিপদজনক বাইক ব্যাবহার করা হয় না।

প্রায় বিনা খরচে জ্যাম থেকে মুক্তি পাওয়ার এত সুন্দর উপায় থাকতে আমরা এখনো গাড়ির দিকে ঝুকছি এবং ভাবছি নতুন নতুন রাস্তা, অতিরিক্রাত লেন আর ফ্লাইওভার তৈরি করলেই মুক্তি মিলবে। না, তা কখনো হবার না। যে সব শহরে মাত্রাতিরিক্ত রাস্তা ও ফ্লাইওভার তৈরি করা হয়েছে, যেমন লস এঞ্জেলেস, শিকাগো, ইত্যাদি শহরে তত বেশি জ্যম বেড়েছে।

মুখস্ত করুন, “শহরে ফ্লাইওভার বাড়লে জ্যাম বাড়ে, বাস আর সাইকেল বাড়লে জ্যাম কমে।”

এদেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া ভাল কিছুই হয় না। উনি যদি দয়া করে আমলা এবং এম পি দেরকে পাবলিক বাস অথবা সাইকেলে চড়ে অফিসে আসার নির্দেশ দিতেন, আমার মনে হয় খুব দ্রুত এ শহর ইউরোপিয়ান শহরের মত বসবাস যোগ্য হয়ে যেত।

লেখকঃ আমিনুল ইসলাম ইমন, আর্কিটেক্ট, বুয়েট

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *