সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং ড্যাপ

১। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০১৬-২০৩৫ এর ভৌত জরিপের তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণে দেখা যায় যে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় (পুরাতন এবং বর্ধিত এলাকাসহ) উন্মুক্ত স্থানের পরিমান মাত্র ১.৩৩% যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই কম। প্রায় ১ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে উন্মুক্ত স্থানের এই পরিমান বড্ড বেমানান।

২। রমনা এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে ঢাকা শহরের ফুসফুস বলে মনে করা হয়। ঢাকা শহরের চারপাশে চারটি নদী, তাদের সাথে যুক্ত অনেক খাল, রমনা এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এই গুলোই ঢাকার পরিচয় এবং গর্বের জায়গা। মাত্র এই কয়েকটা অতি প্রয়োজনীয় উপাদানকে আমরা রক্ষা না করে ক্রমেই নষ্ট করে ফেলছি। আরও দুঃখের বিষয় হলো এই যে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর হয়ে গেলেও রমনা এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো আর একটা উদ্যান আমরা করতে পারিনি।

৩। বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে কেন্দ্র করে সরকার যে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছে তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে নাকি অন্যান্য উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি কয়েকটি রেস্টুরেন্ট করবে, যার কারনে অনেক গাছ কাটা পড়বে এবং ইতিমধ্যে অনেক গাছ কেটেও ফেলা হয়েছে।

৪। ঢাকা শহরে কোথায় কি ধরনের উন্নয়ন হবে বা উন্নয়ন করতে হলে তার জন্যে কি ধরনের নীতিমালা বা শর্ত মেনে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে তার দিকনির্দেশনা এবং সেই অনুযায়ী দেখভালের দায়িত্ব মুলত রাজউকের উপর বর্তায়। রাজউকের কাছে সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা আছে তবে তার বাস্তবায়নে অনেক পিছিয়ে আছে।

৫। রাজউক কর্তৃক প্রণীত খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০১৬-২০৩৫ এর প্রস্তাবিত ভূমি ব্যবহার জোন পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে আলোচ্য রমনা এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে উন্মুক্ত স্থান এলাকা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে অর্থাৎ যে কোন মূল্যে সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। ড্যাপে বলা হয়েছে যে এই জোনের মূল উদ্দেশ্য নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিনোদন চাহিদা পূরণ করা, পাশাপাশি মানুষের জন্য প্রকৃতির অফুরন্ত প্রাকৃতিক শোভা ও সৌন্দর্য্ সংরক্ষণ করা।

৬। যেহেতু উন্মুক্ত স্থান শহর বা সর্বোপরি মানুষের জন্যে, এই বিবেচনায় খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০১৬-২০৩৫ শর্ত স্বাপেক্ষে কিছু স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন করা হয়েছে, যা নিম্নরূপঃ

  • জিমনেসিয়াম, গ্রন্থাগার, পর্যবেক্ষণাগার, এবং গণ শৌচাগার
  • মেঝের ক্ষেত্রফল (Ground Coverage) মোট ক্ষেত্রফলের 10% বা ৪০০০ বর্গফুটের বেশী (যেটি কম) হবে না, স্থাপনার উচ্চতা সর্বোচ্চ ৪ তলা পর্যন্ত হবে।
  • ইকো-রিসোর্ট (ভূমির প্রাকৃতিক তল (Terrain) বা বন্ধুরতা (Undulation) পরিবর্তন করা যাবে না, স্থানীয় উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের (Local flora and fauna) অস্তিত্ব ও বিকাশে ব্যাঘাত ঘটায় এমন কার্যক্রম করা যাবে না, স্থানীয় উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের বাইরে সম্পূর্ণ নতুন ও ভিনদেশি প্রজাতির (Alien species) প্রবর্তন করা যাবে না, সাইটের ভেতরে যান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল অনুমিত হবে না ছাড়াও আরও অনেক শর্ত আছে)

৭। খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা ২০১৬-২০৩৫ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে নিয়ে সরকারে প্রস্তাবনা বিশ্লেষণে দেখা যায় যে ভূমি ব্যবহারে বড় ধরনের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে যা একেবারেই ড্যাপের প্রস্তাবিত সুপারিশের বিরুদ্ধে যায় এবং যা গাছ কর্তনের চেয়েও গুরুতরও ব্যত্যয় বলে প্রতীয়মান হয়।

৮। নগরের সবুজায়নের মূল লক্ষ্য সৌন্দর্যবর্ধন না। মূল লক্ষ্য মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা এবং সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। ড্যাপে এ খাল, রাস্তা এবং পার্কের ডিজাইন এমনভাবে করতে বলা হয়েছে যেন সেগুলো Public Health Infrastructure হিসাবে কাজ করে।

৯। এ অবস্থায় যেকোন উন্নয়ন প্রকল্প, বিশেষ করে এ ধরণের স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে, তা সে বেসরকারী হোক বা সরকারী, নগরের পরিকল্পনার নির্দেশনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন হওয়া এই শহরের বাসযোগ্যতার যতটুকুই অবশিষ্ট আছে, তা ধরে রাখার জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

লেখকঃ আবু মুসা জিন্নাহ। টাউন প্ল্যানার। ইউ,আর,পি। বুয়েট।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *